আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ সাবির শাহ (মুদ্দাযিল্লহুল আলী)’র সংক্ষিপ্ত জীবন পরিক্রমা
হযরতুল আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ সাবির শাহ সৈয়্যদযাদা, অসাধারণ জ্ঞানী ও গুণী, সর্বোপরি আধ্যাত্মিকতা ও দূরদর্শিতায় অতি সমৃদ্ধ | তিনি বর্তমানে স্বদেশের প্রাদেশিক পরিষদের সাংসদ ও সিনেটর | তিনি একজন দেশপ্রেমিক, সমাজ সেবক ও আদর্শ রাজনীতিবিদ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন | জনপ্রিয় স্বনামধন্য এ ব্যক্তিত্ব রাজনৈতিক অঙ্গনে পদার্পণের একটি ঘটনাও জানা যায় | তিনি স্বদেশের এবেটাবাদ কলেজ হতে গ্রেজুয়েশন, আরবী সাহিত্য ও ইসলামী শিক্ষায় ডিপ্লোমা এবং ইসলামাবাদ আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় হতে ইসলামী শরীয়া বিষয়ে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন | অতঃপর তিনি উচ্চতর জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে মিশর আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির অনুমতি চাওয়ার জন্য শ্রদ্ধেয় পিতা হযরতুল আল্লামা সাইয়্যেদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হির নিকট হাযির হন | জুমার দিন ছিলো | স্থানীয় জনসমাগমও | তিনি ওখানে কি হচ্ছে তা দেখার জন্য বের হন | সেখানে গিয়ে তিনি দেখতে পেলেন নির্বাচন প্রার্থীর মনোনয়ন নিয়ে স্থানীয়ভাবে মিটিং চলছিল | ঐ মিটিং-এ তাঁর পিতা হুযূর ক্বেবলা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহও উপস্থিত ছিলেন | তাঁকে দেখে উপস্থিত লোকজন সমস্বরে বলে উঠলেন, ‘‘ ইনিই নির্বাচন প্রার্থী হবেন |’’
হযরত আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ সাবির শাহ মুদ্দাযিল্লুহুল আলীর এ ঘটনাটি ১৯৮৫ সালে ঘটেছিল | সেই থেকে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয় এবং প্রায় প্রতিবারই বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে এসেছেন তিনি | রাজনৈতিক নানা প্রতিকুলতার মাঝে নির্বাচনে তাঁর বিজয় প্রমাণ করে যে, তিনি দেশ, জাতি, সমাজ, দ্বীন-মাযহাবের একনিষ্ঠ সেবক | তিনি একজন যোগ্য ও আদর্শ রাজনীতিবিদ | ফলে তিনি ১৯৯৩ ইং সালে পাকিস্তানের প্রাদেশিক মূখ্যমন্ত্রী হন, ১৯৯৭ইং এবং ১৯৯৯ ইং সনে ওই দেশের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ছিলেন | বর্তমানে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর রাজনীতিবিদদের মধ্যে আধ্যাত্মিক চর্চা যেখানে মৃতপ্রায়, সেখানে রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁর আবির্ভাব ও সফল কর্মকান্ড তাঁদের মাঝে নবপ্রাণের সঞ্চার করে | তিনি সৎ ও যোগ্য রাজনীতিবিদদের প্রেরণা, সত্যের পতাকাবাহী সিপাহ্সালার, দূর্নীতিবাজ ও নিশাচরদের জন্য ভয়াবহ তুফান, অসহায়দের হিম্মত, দিশেহারাদের একান্ত বন্ধু ও সুন্নী জনতার প্রাণস্পন্দন | রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনি বহুলভাবে জনপ্রিয় এবং তাঁর নামের সাথে ‘পীর’ শব্দটির ব্যবহার বেশ লক্ষ্যণীয় | এমনিতে বংশীয় ও পৈত্রিক সকল গুণাবলীর ধারক তিনি | যে কোন প্রতিকূল পরিবেশ-পরিস্থিতিতে তিনি অবিচল থাকেন | এটা তাঁর স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য | তাঁর বয়স যখন ৪/৫, একদা সিরিকোটের সেই সুউচ্চ পাহাড়ের উপর হতে হঠাৎ গড়িয়ে পড়েন; অথচ তিনি কাঁদেনও নি, বিন্দুমাত্র ঘাবড়ানও নি; বরং শরীরে লেগে যাওয়া ধূলিবালি স্বাভাবিকভাবে ঝাড়তে ঝাড়তে দাঁড়িয়ে গেলেন |
এ দৃশ্য অবলোকনে তাঁর পিতামহ আল্লামা সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটি রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি ঘোষণা দিলেন-
صابر شاه ملك بنگال كا پير هوگا
(সাবির শাহ্ বঙ্গদেশের পীর হবেন) | সেদিন হতে তিনি ‘পীর সাবির শাহ্’ নামে পরিচিত |
হুযূর-ই আকরাম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর এ ৪০তম বংশধর ১৯৫৫ সালে পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের সিরিকোটে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৭৬ সালে শ্রদ্ধেয় বড় ভাই আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তাহের শাহ্ মুদ্দাযিল্লুহুল আলীর সাথে পিতা হতে খিলাফত প্রাপ্ত হন; অথচ স্বনামধন্য এ আওলাদ-ই রাসূলকে দেখা গেছে যে, বড় ভাই-এর সম্মুখে তিনি শিষ্যতুল্য হয়ে থাকেন | সুতরাং ওলী হওয়ার মর্যাদা তাঁর মাতৃগর্ভজাত আর আধ্যাত্মিক চর্চা তাঁর সহজাত | মহান আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রতি দৃঢ় আস্থা তাঁর ভিত, নবীজিই তাঁর মডেল | ইশক্বে রসূল তাঁর উপকরণ, সুন্নাত তাঁর ভূষণ, সুন্নীয়াতই তাঁর মতাদর্শ, ফিক্বহে হানাফীতে তাঁর অনুশীলন, পারিবারিক শিক্ষা-দীক্ষা ও তত্ত্বাবধানই এ সবের উৎস এবং তাঁর আধ্যত্মিক ও আধুনিক চিন্তাধারা এ সবের ফসল | তাই তো তাঁর বাড়ীর সন্নিকটে নির্মিত মডার্ণ ইসলামী শিক্ষা নিকেতন ‘তৈয়্যবুল উলূম এডুকেশন কমপ্লেক্স’, যা সংক্ষেপে ‘জামেয়া তৈয়্যবিয়া’ নামে পরিচিত তা অনন্তকাল ধরে আগামী প্রজন্মের নিকট এ সবের স্বাক্ষী হয়ে থাকবে | অবশ্য তাঁর শ্রদ্ধেয় বড় ভাই এ প্রতিষ্ঠান নির্মাণে পৃষ্ঠপোষকতা করে যাচ্ছেন |
আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ সাবির শাহ্ মুদ্দাযিল্লুহুল আলী সরকারী-বেসরকারীভাবে এশিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রাষ্ট্রে ভ্রমণ করেন | রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক এ ব্যক্তিত্বকে এমনও দেখা যায় যে, যখন তাঁর বাড়ীর কোন অনুষ্ঠানে তিনি খাবার গ্রহণ করেন, তখন তাঁর সাথে একই রিকাবীতে খাবার গ্রহণ করে থাকেন ফক্বীর-মিসকিন ও সমাজের দরিদ্র শ্রেণীর লোকেরাও | রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা ও তীক্ষ্মতায় তিনি যেমন উন্নতির শীর্ষে উপনীত হন, তেমনি ইবাদত-রিয়াযতের মাধ্যমে সাধন করেছেন চরমোৎকর্ষ | তাঁর আধ্যাত্মিকতার প্রভাব রীতিমত বিস্ময়কর | এ প্রসঙ্গে তাঁর পিতা আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি’র খাদিম মরহুম আইয়্যূব আলী চৌধুরী বলেন, ‘‘আল্লামা সাবির শাহ্ শৈশবে ১৯৬৭ সনে তাঁর পিতার সঙ্গে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) আসেন | তখন একটি মাহফিলে যাওয়ার জন্য আমরা একটি কার-এ উঠি | আমাদের সাথে ওই গাড়ীতে ছিলেন আল্লামা আযীযুল হক শেরে বাংলা রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হিও আর গাড়ীর সামনের সিটে বসেছিলেন হুযুর কেবলা আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি | গাড়ী হতে নামার পর শেরে বাংলা রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি আল্লামা সাবির শাহ্ মুদ্দাযিল্লুহুল আলীর দিকে ইশারা করে আমাকে বলেন, ‘‘আয়ূব আলী! এ পীরযাদা একজন অস্বাভাবিক ধরনের উঁচু মাপের ওলী !’’ আল্লাহ্ তাঁকে দীর্ঘায়ু দান করুন | তাঁর সান্নিধ্য আমাদেরকে ধন্য করুন | আ-মী-ন |